কামরুল ইসলাম
বাংলার ঐতিহ্যবাহী শারদীয় দুর্গাপূজা আজ সমাপ্ত হলো। জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা বিসর্জন ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর চট্টগ্রাম জেলার মোট ২,২০২টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। পুরো উৎসবকালীন সময়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং ভক্ত-দর্শনার্থীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছে।
১। প্রশাসনিক ও সমন্বয়মূলক কার্যক্রম:
পূজা শুরুর পূর্বেই জেলা ও উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদ, পূজা কমিটি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক সমন্বয় সভা করা হয়। এতে নিরাপত্তা পরিকল্পনা, ঝুঁকিপূর্ণ মণ্ডপ চিহ্নিতকরণ, দায়িত্ব বণ্টন ও করণীয় নির্ধারণ করা হয়।
সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, প্রতিমা শিল্পী ও স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে পৃথক পৃথক সভা আয়োজন করা হয় যাতে তারা নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশীদার হতে পারে।
প্রতিটি থানায় ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা নির্ধারণ করা হয়, যারা পূজামণ্ডপ কমিটির সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।
গুজব প্রতিরোধ ও যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি Standard Operating Procedure (SOP) প্রণয়ন করা হয়। এতে প্রতিটি স্তরে কীভাবে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে তার স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়।
২। মাঠপর্যায়ের নিরাপত্তা কার্যক্রম:
প্রতিটি থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) পূজামণ্ডপ কমিটির সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে নিরাপত্তার বিষয়গুলো নিশ্চিত করেন।
পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরেজমিনে গিয়ে পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। জেলার প্রতিটি পূজামণ্ডপে মোট ২,৪৫২ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়, যারা পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন।
প্রতিটি থানায় Quick Response Team (QRT) প্রস্তুত রাখা হয়, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
দর্শনার্থীদের চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে বিশেষ ট্রাফিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। যানজট নিরসনে বিকল্প রুট নির্ধারণ ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
রাতের বেলা বিশেষ টহল, চেকপোস্ট জোরদার ও ভ্রাম্যমাণ টহল টিম মোতায়েন করা হয়। আনসার ও ভলান্টিয়ারদের নিয়ে সমন্বিত নিরাপত্তা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, যাতে প্রতিটি মণ্ডপে জনগণের আস্থা তৈরি হয়।
কোন প্রকার বিরোধের সংবাদ পাওয়া মাত্রই সার্কেল অফিসার, অফিসার ইনচার্জ সরেজমিনে উপস্থিত হয়ে স্থানীয় জনসাধারণকে নিয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধান করা হয়।
৩। গোয়েন্দা ও সাইবার মনিটরিং কার্যক্রম:
পূজামণ্ডপ ঘিরে সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ বা নাশকতা সৃষ্টিকারী যেকোনো চক্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়।গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব প্রতিরোধে জেলা পুলিশের সাইবার মনিটরিং সেল সক্রিয় থাকে।
গুজব বা অপপ্রচার সংক্রান্তে তাৎক্ষণিকভাবে কাউন্টার ন্যারেটিভ প্রচার করা হয় এবং গুজব প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
৪। জনসংযোগ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম:
জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিতভাবে সাংবাদিকদের ব্রিফিং দেওয়া হয়, যাতে জনগণ সঠিক তথ্য পায়।
পূজামণ্ডপে আগত ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য সচেতনতামূলক ঘোষণা ও নির্দেশনা দেওয়া হয়, যেমন—ব্যাগ তল্লাশি, লাইটার/দাহ্য পদার্থ বহন না করা, শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা ইত্যাদি।
স্থানীয় জনসাধারণকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সম্পৃক্ত করার জন্য পুলিশ সুপার বিভিন্ন স্থানে পথ সভা করেন।
শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রচার কার্যক্রম জোরদার করা হয়। জেলা পুলিশের সকল কার্যক্রম “চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ” ফেইসবুক পেইজে নিয়মিত পোস্ট ও লাইভ করা হয়।
৫। পুলিশ সুপারের বিশেষ ভূমিকা:
পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুল ইসলাম সানতু বিপিএম-বার জেলার ১৭টি থানার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা প্রস্তুতস্থল, পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা বিসর্জনস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।
তিনি মাঠপর্যায়ে উপস্থিত থেকে পুলিশ সদস্যদের কাজ তদারকি করেন এবং যেকোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিক সমাধান দেন। ভক্ত-দর্শনার্থীদের সাথে মতবিনিময় করে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। সর্বস্তরের জনগণকে আশ্বস্ত করেন যে, জেলা পুলিশ সর্বদা জনগণের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় বদ্ধপরিকর।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোঃ সাইফুল ইসলাম সানতু বিপিএম-বার বলেন— “শারদীয় দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মহোৎসব। এ বছর শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদযাপন নিশ্চিত করতে জেলা পুলিশের প্রতিটি সদস্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। পূজার সময় কোনো বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি—এটি আমাদের সবার যৌথ সাফল্য। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও প্রয়োজন।”
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সফলভাবে শারদীয় দুর্গাপূজা-২০২৫ এর নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। বর্তমানে প্রতিমা বিসর্জন নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে জেলার প্রতিটি থানার পুলিশ সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
দুর্গাপূজা ২০২৫ উদযাপনের সময় দায়িত্বপরায়ণ পুলিশ সদস্যদের উৎসাহিত করতে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার প্রত্যেক সদস্যকে “ডাবল জিএস” পুরস্কার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন।
জেলা পুলিশ তাদের নিষ্ঠা ও সাহসিকতার জন্য সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের শান্তিপ্রিয় জনসাধারণকে পুলিশের কাজে সহযোগিতার জন্যে আন্তরিক অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানানো হচ্ছে।