মাওলানা হাবিবুর রহমান: এক জীবন, রাজনীতি ও বিতর্ক

 

মোঃ নাঈম উদ্দীন
কার্পাসডাঙ্গা প্রতিনিধি
দামুড়হুদা, চুয়াডাঙ্গা।

মাওলানা হাবিবুর রহমান (আনুমানিক ১৯৩৫ – ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১০) ছিলেন বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলার একজন প্রভাবশালী ইসলামি বক্তা ও রাজনীতিবিদ।

তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর জীবন একদিকে যেমন ধর্মীয় শিক্ষা ও রাজনৈতিক কর্ম দিয়ে চিহ্নিত, তেমনি অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার বিতর্কিত ভূমিকা এবং আলোচিত মন্তব্যের জন্যেও তিনি পরিচিত।

ব্যক্তিগত জীবন ও শিক্ষা-

হাবিবুর রহমান আনুমানিক ১৯৩৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির নদিয়া জেলার চাপড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫০ সালে তাঁর পরিবার বর্তমান বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদার হোগলডাঙ্গা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করে।

ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত মাওলানা হাবিবুর রহমান প্রথমে কুমিল্লা কামরাঙ্গীরচর ও পরে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে তাঁর কামিল ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

রাজনৈতিক জীবন ও সংসদ সদস্য হিসেবে কার্যকাল-

মাওলানা হাবিবুর রহমান রাজনীতিতে যুক্ত হন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর হয়ে। তিনি ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ছিলেন।

এই আসনে তাঁর পূর্বসূরী ছিলেন হাবিবুর রহমান হবি। তাঁর সময়ে তিনি যেমন রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন, তেমনি ইসলামি বক্তা হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল।

বিতর্কিত ভূমিকা: মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ-

মাওলানা হাবিবুর রহমানের জীবনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন তাঁর ভূমিকা। অভিযোগ রয়েছে যে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন।

তাঁর বিরুদ্ধে কয়াগ্রামের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাককে হাসাদহ ক্যাম্পে নিয়ে হত্যা ও তাঁর লাশ গুমের অভিযোগ উঠেছিল।

স্বাধীনতার পর, ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি তাঁকে দালাল আইনে গ্রেফতার করা হয় এবং দালাল আইনে সাজাপ্রাপ্ত ৭৫২ যুদ্ধাপরাধীর সঙ্গে তাঁকেও সাজা দেওয়া হয়েছিল।

তবে, পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান সরকার দালাল আইন বাতিল করলে অন্যান্যদের সাথে তিনিও কারামুক্ত হন।

সংসদে আলোচিত মন্তব্য-

রাজনৈতিক জীবনে তিনি একটি আলোচিত মন্তব্যের জন্যেও সারাদেশে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদে তিনি বিএনপি-র প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে মন্তব্য করেছিলেন, ‘‘কার অছিলায় শিন্নি খাইল্যা.. মোল্লা চিনলা না’’, যা সেসময় ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছিল।

শেষ জীবন-

মাওলানা হাবিবুর রহমান বার্ধক্যজনিত অসুস্থতা কারণে ২০১০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলার লোকনাথপুরের নিজ বাসভবনে মৃত্যুবরণ করেন।

মাওলানা হাবিবুর রহমান একাধারে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, ইসলামি ব্যক্তিত্ব এবং ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্র, যিনি তাঁর কর্ম ও মন্তব্যের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ছাপ রেখে গেছেন।

শেয়ার করুনঃ